Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের কৃষি

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের কৃষি

সম্পর্কিত সংবাদ

চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ, রাশিয়া এবং ব্রাজিল একত্রে ২০২২ সালে বিশ্বেও বৃহত্তম গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণকারী। এই দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০.১ শতাংশ, বৈশ্বিক দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬১.২ শতাংশ, বৈশ্বিক জীবাষ্ম জ্বালানি খরচের ৬৩.৪ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের ৬১.৬ শতাংশ করে থাকে। বিশ্বের ১৫২টি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ মিলে প্রতি বছর কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে মাত্র ১৭.৭ শতাংশ যা দেশপ্রতি গড়ে ০.১১ শতাংশ। অথচ এই দরিদ্র দেশগুলোকেই আজকে লড়তে হচ্ছে জলবায়ুগত পরিবর্তনের রোষানলে পড়ে যার মধ্যে বাংলাদেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকা ৬ষ্ঠ দেশ। ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে কার্বন-ডাই অক্সাইড ছিল যা জীবাষ্ম জ্বালানির দহনের ফলে ৭১.৬ শতাংশ। মিথেন গ্যাসের মোট অবদান ২১ শতাংশ, নির্গমনের অবশিষ্ট অংশ নাইট্রাস অক্সাইড যা ৪.৮ শতাংশ এবং ফ্লোরিনেটেড গ্যাস ২.৬ শতাংশ নিয়ে গঠিত। ফলে ২০২২ সালে গ্লোবাল গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন ১.৭ শতাংশ বেড়ে ৫৩.৮ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন-ডাই অক্সাইড সমতুল্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৭০ সালে বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ ছিল ২৪.৫ বিলিয়ন টন যা ১৯৯০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩.২৭ বিলিয়ন টন। ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করলে, বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন বর্তমানে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান চালক। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়ছে। ১৮৮০ সাল থেকে, পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রতি দশকে গড়ে ০.১৪০ ফারেনহাইট (০.০৮ ০ সেলসিয়াস) বা মোট প্রায় ২০ ফারেনহাইট বেড়েছে। ১৯৮১ সাল থেকে উষœতার হার দ্ধিগুণেরও বেশি দ্রুত; ০.৩২০ ফারেনহাইট প্রতি দশকে বেড়েছে। নাসার বিশ্লেষণ অনুসারে, ২০২২ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২০১৫ এর সঙ্গে রেকর্ডে ৫ম উষœতম হিসেবে পৌঁছেছে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৬০ ফারেনহাইট যা নাসার বেইজলাইন পিরিয়ডের (১৯৫১-১৯৮০) গড় থেকে বেশি ছিল। কৃষি বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থনৈতিক খাত এবং দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষিই দেশের প্রধান চালিকা শক্তি। বাংলাদেশের ভৌগলিক আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার যার প্রায় ৮০ শতাংশ সমতল ভূমি, দক্ষিণ-পূর্বে ১১ শতাংশ পাহাড়ি এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের অবশিষ্ট উচ্চভূমি নিয়ে গঠিত। প্রধান নদ-নদী গঙ্গা, ব্রক্ষপুত্র ও মেঘনার সব মিলিয়ে ২৩০টিরও বেশি উপনদী প্রবাহমান রয়েছে। বাংলাদেশ উপ-গ্রীষ্মম-লীয় মৌসুমি জলবায়ু দ্বারা প্রবাহিত যেখানে ৬টি ঋতু রয়েছে। দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৭০ সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১০ সেলসিয়াস। গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৪২৯ থেকে ৪৩৩৮ মিমি. এবং সর্বাধিক বৃষ্টিপাত অর্থাৎ ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে জুলাই-অক্টোবর মাসের মধ্যে। ১৮৯১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মোট ২০১টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে যেখানে অনেক প্রানহানির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ফসল, মাছের ঘের এবং গবাদিপশু। জাতিসংঘের আইপিসিসির গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ৬ষ্ঠ অবস্থানে আছে। বাংলাদেশে জলবায়ু সর্ম্পকিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, শিলাবৃষ্টি, অতি বৃষ্টি, বজ্রপাত ইত্যাদি। দেশের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই এবং মাটির স্বাস্থ্য, মাটির অম্লতা, লবণাক্ততা, উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে, বেড়েছে জলাবদ্ধতা, নদী ভাঙনে বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা, ২০২২ বিলীন হচ্ছে বাড়িঘরসহ কৃষিজমি, অসময়ে শুকিয়ে যাচ্ছে নদীনালা যা সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলছে। ২০০৭ এবং ২০১২ সালে উপকূলীয় এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বায়ুভিত্তিক তাপপ্রবাহের কারণে বোরো ধানের উৎপাদন যথাক্রমে ৬.৩৫ ও ১০.৬৫ শতাংশ কম হয়। ২০২৩ সালেও হাওর অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশ প্রতিবছর জিডিপির ২ শতাংশ হারাচ্ছে এবং অনুমান করা হয় যে, ২০৫০ সাল নাগাদ এই ক্ষতি ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। সরকারি এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, শুধু জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণেই কৃষির উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, অন্যদিকে কৃষির ফলন কমেছে ৭-১০ শতাংশ। জলবায়ুর পরিবর্তন বাংলাদেশে কেবল কৃষির ফলনই কমাচ্ছে না; এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও গুনগতমানের উপরও প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের কারণে কীটপতঙ্গ ও রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে যা ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া খাদ্য সরবরাহ এবং স্টোরেজ ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোর অবনতি ঘটায় যার ফলে খাদ্য পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসুচী (ইউএনডিপি) এর ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে যার ফলে দেশে দারিদ্রতা এবং অপুষ্টি বেড়েছে। গবেষণা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশ কিছু সমস্যার দ্বারা বেষ্টিত একটি জটিল সমস্যা। অভিযোজনের বড় বাধা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সম্পদের অভাব। দেশের বেশির ভাগ মানুষ যারা কৃষির সঙ্গে জড়িত তারা হলো প্রান্তিক কৃষক, যাদের জলবায়ু সহনশীল কার্যকলাপে বিনিয়োগ করার জন্য অর্থায়নের অভাব রয়েছে। এর কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা প্রায়ই জলবায়ু সংবেদনশীল কৃষি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে, যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত স্থায়ীত্বের জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (২০২১) অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ইন্টারন্যানাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণগুলোর প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে। সমীক্ষায় আরো বলা হয়, উচ্চ তাপমাত্রা, বন্যা এবং অন্যান্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের গম উৎপাদন ৩০ শতাংশ, ভুট্টা ১৪ শতাংশ এবং আলুর উৎপাদন ৬ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাড) এর ২০১৮ সালের মূল্যায়ন অনুসারে দেখা যায়, দেশের কৃষকদের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতিতে নিযুক্ত ছিলেন। সুতরাং দেশের গ্রামীণ পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য তথা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে টেকসই ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে। সেইসঙ্গে, দেশের খাদ্যব্যবস্থায় স্থিতিবস্থা নিয়ে আসতে এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য দেশের বিভিন্ন জলবায়ু সংবেদনশীল এলাকাভিত্তিক শস্যবিন্যাসে পরিবর্তন ও সংযোজন আনা জরুরি। দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন ক্লাইমেট ভালনারেবল এলাকার জন্য জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে যেগুলো মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। দেশের চাষের জমি প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে কমছে, সেইসাথে ১.৩ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে যার জন্য দেশের খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে বাঁধ সেধেছে প্রকৃতি তথা জলবায়ুর পরিবর্তন। কাজেই খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল রেখে উৎপাদন বাড়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং তার মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সম্পসারণ। জলবায়ুজনিত প্রতিকূলতা প্রশমনে পরিবর্তিত জলবায়ু উপযোগী লাগসই প্রযুক্তিগুলো বিশেষ করে লবণাক্ত এলাকা, খরাপ্রবণ এলাকা, নাবি খরাপ্রবণ এলাকা, নাবি বন্যাপ্রবণ এলাকা, ঠা-াপ্রবণ এলাকা, অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা এলাকা, মঙ্গাপীড়িত এলাকাভিত্তিক ফসলের জাত সেই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয় শস্যবিন্যাসগুলো অনুসরণ করে ধানসহ সব ধরনের ফসল চাষের মধ্য দিয়ে দেশের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য ও কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী দিনের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আরও সহনশীল ও উচ্চফলনশীল বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করে যাবে যা ভবিষ্যতের চাহিদা অনুযায়ী দেশের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।

[লেখক : কনসালট্যান্ট, গেইন বাংলাদেশ]

সম্প্রতি

আরও খবর