Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়কুষ্ঠ ও বৈষম্য : মানবাধিকারের প্রশ্নে একটি অবহেলিত অধ্যায়

কুষ্ঠ ও বৈষম্য : মানবাধিকারের প্রশ্নে একটি অবহেলিত অধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ

বর্তমানে দেশে বিভিন্ন খাতে সংস্কার করা একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত অন্যতম একটি বিষয়। কুষ্ঠ স্বাস্থ্য খাতের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়, যা সংস্কারের ক্ষেত্রে যথাযথ মনোযোগের দাবি রাখে। বাংলাদেশে কুষ্ঠ অন্যতম একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সমস্যা। যদিও মূলত স্বাস্থ্য সমস্যা, তবে কুষ্ঠ অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক সমস্যা সৃষ্টির জন্যও দায়ী। যদি কেউ এই রোগের কারণে প্রতিবন্ধী হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজকর্ম করতে পারেন না, তারা পরিবার এবং সমাজের জন্য বোঝা হয়ে ওঠেন। যেহেতেু কুষ্ঠরোগের বিষয়ে কুসংস্কার রয়েছে, তাই কুষ্ঠ রোগীরা এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরাও বৈষম্যের শিকার হন, যার ফলস্বরূপ তাদের কর্মসংস্থান, বিয়ে, শিক্ষা এবং অন্যান্য সামাজিক ক্রিয়াকলাপের জন্য সমস্যায় পড়তে হয়। তারা সমাজ কর্তৃক এক ধরনের বয়কটের শিকার হন

কুষ্ঠ বিষয়টি সরাসরি দুটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসডিজি টার্গেট ৩ : সুস্বাস্থ্য এবং কল্যাণ। এটি সমৃদ্ধ এবং টেকসই সমাজগুলোর ভিত্তি হিসাবে সুস্বাস্থ্যের গুরুত্বকে জোর দেয় এবং বৈষম্য হ্রাস এবং অংশীদারত্বকে উৎসাহিত সহ অন্যান্য এসডিজির সঙ্গে স্বাস্থ্যের আন্তঃসংযোগকে তুলে ধরে। এসডিজি টার্গেট ১০ : বৈষম্য হ্রাসকরণ : এটি সমান চিকিৎসার পক্ষে এবং কুষ্ঠরোগের সঙ্গে বসবাসকারী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য হ্রাস করার পক্ষে প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বলা যেতে পারে কুষ্ঠ ইস্যুটি এসডিজি অর্জনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যদি কুষ্ঠ ইস্যুটি জাতীয়ভাবে অবহেলিত হয় তবে বাংলাদেশ এর পক্ষে এসডিজি’র টার্গেট অর্জন করা কঠিন হতে পারে। আমাদের জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে কুষ্ঠ ইস্যুটি সঠিকভাবে সমাধান করা হলে বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে উপকৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে বলে অনেকে মনে করেন। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সংকট মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাপী এ্ই সংকটগুলো কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিপর্যয়কর হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কুষ্ঠরোগ একটি অবহেলিত গ্রীষ্মম-লীয় রোগ, যা এখনো বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে দেখতে পাওয়া যায়।

যদিও কুষ্ঠ ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগ তৈরির জন্য দায়ী, তবুও এই বিষয়টি দেশে অবহেলিত ছিল। বিষয়টি তার প্রাপ্য জাতীয় মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ন্যাশনাল লেপ্রসী প্রোগ্রাম (এনএলপি) এর তথ্য অনুসারে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রায় ৩০০০ থেকে ৩৫০০ নতুন কুষ্ঠ কেস শনাক্ত করা হয়েছে, তবে আসল সংখ্যাটি এর দ্বিগুণ।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কুষ্ঠ হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রামক রোগ যা মূলত মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রে নামক এক ধরনের ব্যাকটিরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। এই রোগটি ত্বক, পেরিফেরিয়াল স্নায়ু, উপরের শ্বাসযন্ত্রের ট্র্যাক্টের শ্লেষ্মা এবং চোখের ওপর প্রভাব ফেলে। শারীরিক বিকৃতি ছাড়াও, কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কুসংস্কার এবং বৈষম্যের মুখোমুখি হন।

তবে, কুষ্ঠরোগ নিরাময়যোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎ্সা প্রতিবন্ধিতা রোধ করতে পারে। প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং আক্রান্তদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার আওতায় আনা হলে কুষ্ঠ নিরাময় হয়। আক্রান্তদের সময়মতো চিকিৎ্সা না করা হলে প্রতিবন্ধিতা দেখা দিতে পারে। গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে ফিজিওথেরাপি এবং পুনর্গঠনমূলক শল্য চিকিৎ্সার প্রয়োজন। আলসার এবং সংক্রামিত ক্ষতগুলির যতœ নেয়া হলে ব্যথা এবং অঙ্গ বিচ্ছেদ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুষ্ঠরোগের প্রভাব আজীবন হতে পারে এবং তাই স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনও সেরকম।

কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের স্বাস্থ্যের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হচ্ছেন। তারা কুসংস্কার এবং বৈষম্যের অবসানের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা তাদের চিকিৎ্সা সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে প্রত্যেকে সমাজে পুরোপুরি ভাবে অংশ নিতে পারে।

কুষ্ঠরোগের ফলে সমাজে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়, সে বিষয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমরা নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করতে পারি না। এমন একটি পৃথিবীর কল্পনা করুন যেখানে স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা হওয়ার আগে অনেক লোক কুষ্ঠরোগের নিরাময় পেতে পারে। যেখানে লোকেরা তাদের সম্প্রদায়গুলোতে ফলোআপ চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে পারে। যেখানে দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং কাঠামোগত বাধা আর মানুষকে একটি পূর্ণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন থেকে বিরত রাখে না।

বৈশ্বিক ক্রিয়া এবং বিনিয়োগের ফলে এই জাতীয় ভিশন সম্ভব। এ কারণেই স্বাস্থ্যকর এবং আরও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গঠনের জন্য কুষ্ঠ আক্রান্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার অংশ হতে হবে।

কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে দরিদ্রতম এবং প্রান্তিক পর্যায়ের। তাদের কথা খুব কমই শোনা হয় বা তারা কম অন্তর্ভুক্ত হয়। তবুও তাদের স্বাস্থ্যের অধিকার আপনার বা আমার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের আকাংক্ষা হলো তাদের অধিকার অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দেশের প্রত্যেকের দায়িত্ব পালনের একটি সুযোগ রয়েছে। সব প্রচেষ্টা একত্রিত করে কুষ্ঠ বিষয়টি সমাধান করার জন্য উদ্যোগ নেয়া উচিত। কুষ্ঠমুক্ত একটি স্বাস্থ্যকর এবং আরও ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গড়ার আন্দোলনে আমরা অবদান রাখতে পারি।

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠমুক্ত দেশ গড়ার ভিশন অর্জনের জন্য ‘একটি জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৩-২০৩০’ তৈরি করেছে। এখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সরকারের দায়িত্ব। আমাদের কুষ্ঠবিরোধী কার্যক্রম হাতে নেয়া দরকার, যেমন এই রোগের বিষয়ে সচেতনাতা বাড়ানো, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা ও চিকিৎসার আওতায় আনা, দেশব্যাপী জটিল কেসসহ এই রোগের চিকিৎসার মানসম্পন্ন চিকিৎসার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করা এবং সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কাঠামোতে কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করার আরও পদক্ষেপ নেয়া।

কুষ্ঠ সময়মতো চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। এর পরীক্ষা এবং চিকিৎসা দেশে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের স্বাস্থ্যের অধিকার যাতে পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে।

দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ এর মতে, স্বাস্থ্যের সংগানুসারে মানসিক স্বাস্থ্য স্বাস্থ্যেরই একটি অংশ। কুষ্ঠজনিত কুসংস্কারের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যার সম্মুখীন হন। স্বাস্থ্য একটি মৌলিক মানবাধিকার। এটি বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবায়, বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সিলিং, প্রবেশগম্যতা প্রয়োজন। এটা না হলে তারা কেবল স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার থেকেই বঞ্চিত হবেনা, বরং তাদের জীবিকা, আনন্দ এবং একটি বিকাশমান জীবনযাপনের সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হবে।

অধিকার কর্মীরা মনে করেন, সংস্কারের বিষয়টি একটি প্রসংশনীয় উদ্যোগ। তবে এটা সবার প্রত্যাশা যে, স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশন বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় স্বার্থে কুষ্ঠ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেবেন, যাতে করে আমরা কুষ্ঠমুক্ত দেশ গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারি। আসুন কুষ্ঠের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার গ্রহণ করি।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক]

সম্প্রতি

আরও খবর