রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়গাজা : এখন শান্তি রক্ষা করবে কে?

গাজা : এখন শান্তি রক্ষা করবে কে?

সম্পর্কিত সংবাদ

ডনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে উচ্চারিত একটি ঘোষণা যেন বিশ্বরাজনীতির আকাশে বজ্রের মতো আঘাত করল ‘গাজা যুদ্ধ শেষ।

বন্দিদের মুক্তি যুদ্ধের শেষ অধ্যায় হলেও শান্তির সূচনা নয়

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে ধুলো এখনো উড়ছে, রক্তের গন্ধ এখনো বাতাসে ভাসছে, আর প্রতিটি প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই প্রশ্ন—এখন কে এই নাজুক শান্তিকে টিকিয়ে রাখবে? ইসরায়েলের মানুষ আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, কিন্তু সেই স্বস্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক গাঢ় ক্লান্তি। তাদের চোখে এখন আর যুদ্ধের আগুন নয়, বরং এক অজানা ভবিষ্যতের ভয়। তারা জানে, বন্দিদের মুক্তি যুদ্ধের শেষ অধ্যায় হলেও শান্তির সূচনা নয়। বহু ইসরায়েলি বিশ্বাস করে—তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা এখন জেরুজালেমের প্রাচীরের ভেতরে নয়, বরং ওয়াশিংটনের হাতে বন্দি। যেন তাদের রাষ্ট্রের হৃদপি- এখনও নিজের মাটিতে নয়, বিদেশি ক্ষমতার করুণার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—জিম্মিদের ফিরে আসার পর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর দৃষ্টি কোন দিকে যাবে? তারা কি এখন সত্যিই শান্তির পথে হাঁটবেন, নাকি এই যুদ্ধের অবসান কেবল নতুন এক রাজনৈতিক নাটকের প্রথম অঙ্ক?

গাজা আজ ধ্বংসের প্রতীক, তবে সেটিই আবার নতুন এক নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও বহন করছে। ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা আকাশের নিচে কেউ কেউ নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখছে, আবার কেউ ভয় পাচ্ছে—এই শান্তি কেবল যুদ্ধের মধ্যবর্তী এক ক্ষণস্থায়ী বিরতি নয় তো? ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যুদ্ধ থেমে যায়, কিন্তু তার ছায়া কখনও মুছে যায় না।

তেল আবিবের রাস্তাগুলোতে এখন নিস্তব্ধতা—কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা যেন হাজারো প্রশ্নে পূর্ণ। জিম্মিরা ফিরে এসেছে, মানুষ হাসছে, সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে ‘জয়’র খবর—তবুও কোথাও একটা গভীর আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে: এই জয় কি সত্যিই ইসরায়েলের, নাকি এটি শুধু এক মহাশক্তির রাজনৈতিক দাবার চাল?

ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় যুদ্ধ শেষ হয়েছে বটে, কিন্তু ইতিহাস বলে—যে যুদ্ধের মঞ্চে রক্ত ঝরে, সেখানে শান্তি রক্ষার কাজটি সবসময়ই সবচেয়ে কঠিন। এখন সেই কঠিন দায়িত্বের মুখোমুখি পৃথিবী—বিশেষত গাজা, যেখানে প্রতিটি ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসছে এক অনন্ত প্রশ্ন ‘যুদ্ধ শেষ হতে পারে, কিন্তু শান্তি রক্ষা করবে কে?”

চুক্তি স্বাক্ষরের সেই সন্ধ্যায় তেল আবিবের আকাশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমেছিল—যেন যুদ্ধের ক্লান্ত ধূলিকণার ওপর হঠাৎ নেমে এসেছে কোনো অদৃশ্য শান্তির পর্দা। এরপরের দিনগুলোতে ইসরায়েলকে দেখে মনে হয়, এক স্বপ্নের ভেতর হাঁটছে একটি জাতি। রাস্তাঘাটে মানুষজন হাসছে—বিনা কারণে, কিংবা হয়তো সবচেয়ে গভীর কারণেই—বেঁচে থাকার আনন্দে। ক্যাফেগুলোর কোণে, যেখান থেকে একসময় ছুটে যেত উদ্বিগ্ন সংবাদ, আজ সেখানে কফির কাপে উঠছে উষ্ণ বাষ্প, তার সঙ্গে মিলেমিশে আছে এক অচেনা প্রশান্তির গন্ধ।

টেলিভিশনের পর্দায়ও বদলে গেছে দৃশ্যপট। সংবাদ পাঠকদের মুখে গম্ভীরতা থাকলেও চোখের কোণে খেলা করছে একরাশ আলো। এক প্রতিবেদক বললেন—‘আজ আমার হাসার দিন’—এ যেন পুরো জাতির মনের কথা। কিন্তু সেই আনন্দের উচ্ছাসের মাঝেও ক্যামেরা যখন ঘুরে যায় দক্ষিণের দিকে, তখন পর্দা জুড়ে ভেসে ওঠে অন্য এক পৃথিবী। রেড ক্রসের গাড়িগুলো যখন ধীরে ধীরে সীমান্ত অতিক্রম করে গাজা থেকে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনে, তখন পেছনের দৃশ্যে দেখা যায় ধ্বংসের নিঃশব্দ শহর—ভাঙা দেয়াল, পুড়ে যাওয়া ছাদ, আর ধুলোমাখা খেলনা পড়ে আছে রাস্তায় —যেখানে একসময় শিশুরা দৌড়ে বেড়াত, যেখানে ছিল জীবনের কোলাহল।

এই দুই দৃশ্য—ইসরায়েলের উচ্ছাস আর গাজার বিপর্যয়—একই মুদ্রার দুই পিঠ। একদিকে স্বস্তির নিঃশ্বাস, অন্যদিকে নিঃশেষের আর্তনাদ। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি এখনো বেজে চলেছে, একপ্রান্তের হাসির ভেতর লুকিয়ে আছে অন্য প্রান্তের কান্না। আগামী দিনগুলোতে হয়তো ইসরায়েলের উৎসব ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হবে, আর বিশ্বের দৃষ্টি ঘুরে যাবে গাজার দিকে—তার পুনর্গঠন, তার শোক, এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই নীরব সত্যের দিকে, যা এখনো উচ্চারিত হয়নি।

এ যেন এক যুগল সিম্ফনি—এক পাশে মুক্তির সংগীত, অন্য পাশে শোকের সুর। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই অসম সুরের মাঝেই কি সত্যিকারের শান্তি টিকে থাকতে পারে?

যুদ্ধ শেষ—এমন ঘোষণা উচ্চারণ করা সহজ, কিন্তু সেই যুদ্ধের ছাই থেকে সত্যিকারের শান্তির ফুল ফুটানো কত কঠিন—তা ইতিহাস বহুবার শিখিয়েছে। আজ ইসরায়েলি সংসদের উজ্জ্বল আলোয়, করতালির গর্জনে, কূটনৈতিক সৌজন্যের নিখুঁত অভিনয়ে হয়তো এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে; কিন্তু এই আলোর নিচেই লুকিয়ে আছে বহু অনুচ্চারিত প্রশ্নের অন্ধকার।

ট্রাম্পের কণ্ঠে যখন শোনা গেল—‘তোমরা জিতেছো’—তখন হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কোনো গাজার মা তার সন্তানকে হারিয়ে নীরবে কাঁদছিলেন। বিজয়ের ভাষা একপাক্ষিক হতে পারে, কিন্তু শান্তির ভাষা সর্বদা দু’পক্ষের। আর সেই ভাষাই এখনো হারিয়ে গেছে বালির স্তূপের নিচে, ধ্বংসস্তুূপের ভিতরে, মৃত শিশুর মুখে জমে থাকা ধুলোর মাঝে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের সফর, নতুন কূটনৈতিক হাসি, আলোচনার টেবিলে কাগজের ফুল—সবই ইঙ্গিত দেয় আরেকটি ‘শান্তিচুক্তি’-র সম্ভাবনা। কিন্তু ফিলিস্তিন কোথায় এই মানচিত্রে? পশ্চিম তীরের ঘরবাড়ি, পূর্ব জেরুজালেমের স্বপ্ন, কিংবা গাজার ভাঙা স্কুলের শিশুদের ভবিষ্যৎ—এই সব প্রশ্নই যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের নিচে। যদি শান্তি মানে কেবল অস্ত্রবিরতি হয়, যদি ন্যায়বিচার সেখানে অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই শান্তি কেবল এক দীর্ঘ অন্তবিরতি মাত্র—আরেকটি ঝড়ের আগে থেমে থাকা বাতাস।

হোস্টেজেস স্কয়ারের জনতার প্রতিক্রিয়া যেন সেই অস্থির বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সেখানে আনন্দ ছিল, কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেও ছিল অস্বস্তি-যেন কোনো অজানা আশঙ্কা আকাশে ঝুলে আছে। নেতানিয়াহুর নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যে ক্রোধের ঢেউ উঠেছিল, তা কেবল রাজনীতির বিরুদ্ধে নয়—তা ছিল অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে, এক অদৃশ্য ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে। আর যখন জনতার কণ্ঠে ভেসে উঠল ‘থ্যাংক ইউ ট্রাম্প’, তখন বোঝা গেল—ইসরায়েলের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল জেরুজালেমের হাতে নেই, তা ভেসে গেছে ওয়াশিংটনের আকাশে।

কিন্তু ট্রাম্পের ইতিহাস এক চঞ্চল শিশুর মতো—যে দ্রুতই নতুন খেলনার খোঁজে ছুটে যায়। হয়তো কালই তিনি মনোযোগ দেবেন ইউক্রেনের দিকে, হয়তো কোনো পুরনো প্রতিপক্ষের দিকে, হয়তো নিজের দেশের অন্তর্দ্বন্ধের দিকে। আর তখন? কে দেখবে গাজার পুনর্গঠন? কে শুনবে সেই শিশুদের কণ্ঠ, যারা এখনো ধ্বংসস্তূপের ধুলো গিলছে? কে রাখবে শান্তির শপথ?

সম্ভবত, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ কারও হাতে নেই। ইতিহাস কেবল জানে—যে শান্তি ন্যায়বিচার থেকে বিচ্ছিন্ন, সে শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই আজ, এই যুদ্ধোত্তর নীরবতার মাঝে, মধ্যপ্রাচ্য দাঁড়িয়ে আছে এক সঙ্কীর্ণ সেতুর ওপর—যেখানে এক পাশে স্বপ্ন, অন্য পাশে ধ্বংস।

ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ শেষ করেছেন, কিন্তু শান্তির যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে। এখন দেখা যাক—এই নাজুক সেতুর ওপারে কে প্রথম পদক্ষেপ রাখে, কে এই ভঙ্গর আশার শিখা জ্বালিয়ে রাখে।

[লেখক: আইনজীবী]

সম্প্রতি

আরও খবর