শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়এনসিপি চায় অবিনাশী জুলাই সনদ

এনসিপি চায় অবিনাশী জুলাই সনদ

সম্পর্কিত সংবাদ

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিরাট খোলা জায়গায় আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১৭ অক্টোবর, ২০২৫-এ জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সনদে স্বাক্ষর করেছে ২২টি রাজনৈতিক দল ও ২টি জোটের নেতা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, মার্ক্সবাদী বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ ও গণফোরাম সেই দিন জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। স্বাক্ষর করেনি গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী ছাত্রদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।

আমেরিকার যে কোন নাগরিক সংক্ষুব্ধ হয়ে নিজের মালিকানাধীন পতাকা ছিড়তে পারে, পোড়াতে পারে। অথচ জুলাই সনদের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে যেতেই পারবে না- জনগণ ঠিক শুনছে তো! এটা কি ফ্যাসিজম নয়?

শুধু স্বাক্ষর নয়, এনসিপি অনুষ্ঠানেও যায়নি। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়া না হলে তারা সই না করার ঘোষণা আগেই দিয়ে রেখেছিল। স্বাক্ষর না করা বাম দলগুলোর আরেকটি আপত্তি হচ্ছে, সনদের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। জুলাই সনদে রাজনীতির সঠিক ইতিহাস না থাকাই স্বাভাবিক, কারণ জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন, ক্ষমতায় অবস্থান করে দলগঠন, বিএনপির শাসনামলের অপকর্ম, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর জঘন্যতম ভূমিকা ইত্যাদির উল্লেখ থাকলে সংশ্লিষ্ট দুইটি দল সনদে স্বাক্ষর করতো না। এই সনদ যথাযথভাবেই আওয়ামী লীগের মু-পাত আর বিজয়ীদের গৌরবগাঁথায় সমৃদ্ধ।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে জুলাই সনদ লেখা হলে প্রশ্ন কম হতো। বাম দলগুলোর আরও একটি আপত্তি আছে এবং তা মৌলিকও। জুলাই সনদে উল্লেখ আছে, এই সনদের ‘বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। বাম দলগুলো এই শর্তকে বলেছে অগণতান্ত্রিক। আমাদের রাজনৈতিক জীবনাচারে গণতন্ত্র কখনোই ছিল না। ধর্ম, সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই চেতনা প্রভৃতি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ আমাদের দেশে নেই। অথচ আমেরিকায় জাতীয় পতাকার ডিজাইনে মেয়েরা ব্রা, বিকিনি পরে সমুদ্র সৈকত ও খেলার মাঠে ছুটে বেড়ায়। আমেরিকার যে কোন নাগরিক সংক্ষুব্ধ হয়ে নিজের মালিকানাধীন পতাকা ছিড়তে পারে, পোড়াতে পারে। অথচ জুলাই সনদের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে যেতেই পারবে না- জনগণ ঠিক শুনছে তো! এটা কি ফ্যাসিজম নয়? স্বৈরতন্ত্র আর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের অংশীজনেরাও দেখি পতিত সরকারের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বেশি ফ্যাসিস্ট।

গোটা জাতিকে সম্পৃক্ত করে জুলাই সনদ স্বাক্ষর হওয়ার গৌরবে মুহাম্মদ ইউনূস যারপরনাই খুশি। কিন্তু জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা ২৪টি দলের মধ্যে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা মাত্র ১৮, অথচ দেশে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫২। এই হিসেবে মাত্র ৩৫ শতাংশ নিবন্ধিত দল সই করেছে। নিবন্ধনের জন্য অপেক্ষায় আছে আরও গোটা চল্লিশেক দল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থান যারা ঘটালো, যারা এই সনদের প্রবক্তা, তারাও চুক্তিতে নেই। তবে এই না থাকাটা সম্ভবত সমঝোতামূলক, তারা প্রেসার গ্রুপ, তারা প্রেসার সৃষ্টি না করলে সরকার নিজ থেকে কিছু করতে সাচ্ছন্দ বোধ করে না। এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গ্যারেন্টি চায় এবং তা হয়েছেও, এখন এনসিপি স্বাক্ষর করবে।

জুলাই সনদের স্বাক্ষরের দিন বিএনপির একটু বেশি মাখামাখি দৃষ্টিকটু মনে হলেও তা স্বাভাবিক, ল-ন বৈঠকের পর ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির গা-ঘেষা হাবভাব অনেক বেড়ে গেছে, তাদের মধ্যে ‘নন-ডিসক্লোজার’ মৌখিক চুক্তিও থাকতে পারে। কারণ বিএনপি কোন বাকবিত-া ছাড়া সব শর্তেই সম্মতি দিয়ে নির্বাচনের দিকে ত্বরিৎ এগুতে চায়। বিএনপির মূল লক্ষ্য ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, এই নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোন কাজ বিএনপি এই মুহুর্তে করবে না। আওয়ামী লীগ না থাকায় রাজনীতির মাঠে যে শূন্যতা বিরাজ করছে তার সুফল তুলতে চায় বিএনপি। এনসিপি আর বিএনপি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে বিস্মিত হবো না। তবে দেশের সর্বত্র আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপির মনোভাবের পরিবর্তন না হলে জাতীয় নির্বাচনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গণেশ উল্টেও যেতে পারে।

জুলাই সনদ বর্তমান সংবিধান পরিপন্থী কি-না, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জুলাই সনদে যথাযথভাবে বিধৃত হয়েছে কি-না, অথবা ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের ভালো-মন্দ ইত্যাদি নিয়ে এখন আর প্রশ্ন করে লাভ নেই। দরকার নেই প্রশ্ন করার, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক দেশের সর্বোচ্চ আদালতের যে অভিমত নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে তার উল্লেখ জুলাই সনদে নেই কেন? ইতোমধ্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে তাতে অন্তর্বর্তী সরকারকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ক্ষমতাবলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ জারির সুপারিশ করা হয়েছে। আদেশ জারির পর হবে গণভোট। গণভোটে প্রস্তাব পাস হলে ২৭০ দিনের মধ্যে সেই আদেশ বাস্তবায়ন করবে আসন্ন নির্বাচনে নির্বাচিত সাংসদদের নিয়ে গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’। আগামী সংসদ ২৭০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে অভিহিত হবে, সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব মোতাবেক সংসদ বিদ্যমান সংবিধান সংস্কার করবে। আর যদি উক্ত সময়ের মধ্যে না করা হয় তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করে রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধনের খসড়া বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হলে গণ্য হবে।

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কমিশনের সুপারিশের বিরোধিতা করছে বিএনপি। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ জুলাই সনদ মোতাবেক সংবিধান সংস্কার না করলে ২৭০ দিন পর অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করে রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধনের খসড়া বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যাবে- এই শর্ত শুধু বিএনপির জন্য নয়, সার্বভৌম সংসদের জন্যও অপমানজনক। স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হওয়ার শর্ত থাকায় ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর মেয়াদ ২৭০ দিন বা ৯ মাস রাখার প্রয়োজন ছিল না। কারণ যারা ক্ষমতায় আসবে তারা সবাই জানে ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবে কী কী আছে। তা ছাড়া যা গণভোটে পাস হবে তা নিয়ে নতুন করে সংসদে আলাপ-আলোচনা অর্থহীন, সময় এবং অর্থ দুটোরই অপচয়।প্রকৃতপক্ষে এই অবস্থায় সাংসদদের একটিই কাজ হবে ‘হাঁ জয়যুক্ত হলো’ বলার প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা।

সংস্কার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি যে সকল ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছিল তাও বাদ দেওয়া হবে সরকারের জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে। এখানেই শেষ নয়, বিএনপি’র আরও একটি পরাজয় হয়েছে। সংসদের উচ্চ কক্ষের গঠন প্রক্রিয়া হবে পিআর পদ্ধতিতে, অর্থাৎ সংসদ নির্বাচনে ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। পরাজয় আরও আছে, বিএনপির প্রস্তাব মোতাবেক সম্ভবত একই তারিখে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে না। বিএনপি’র অবস্থা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিউমার সমৃদ্ধ ‘রাজী’র মতো। প্রবীণ বয়সে রবি ঠাকুর সিড়ি দিয়ে লাইব্রেরি থেকে নামছেন, চোখে কম দেখেন, তখন একটি মেয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, রবি ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে ?’ মেয়েটি উত্তরে বলল, ‘আমি রাজী’। রবি ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমিও রাজী’।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া বাকি সব কাজে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর কথামতো চলতে বাধ্য থাকতে হয় বিধায় সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্টের মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে। অথচ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংসদকেও রাষ্ট্রপতির মতো নিষ্কর্মক বানিয়ে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিজম স্বার্থকেন্দ্রিক, নিজ স্বার্থে সকলেই ফ্যাসিজমে বিশ্বাস করে। জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তিকরণের কোন বিকল্প নেই, এই ক্ষেত্রে তাই কমিশন ও সরকার সকলেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট। ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’- এই প্রশ্নটি গণভোটের ব্যালটে রাখার সুপারিশে করেছে কমিশন। গণভোট অতীতে কয়েকবার হয়েছে, এই ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ থাকে না বিধায় জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায় না, কিন্তু ৯৮ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়ে যায়।এবারও জনগণ ভোটকেন্দ্রে না গেলে ইতিহাসে বাক্স ভর্তি করার আরেক কেলেঙ্কারির বর্ণিল ঘটনা লিপিবদ্ধ হবে।

‘জুলাই জাতীয় সনদের মাধ্যমে বর্বরতা থেকে সভ্যতায় আসলাম’- মুহাম্মদ ইউনূসের এই কথা শোনার পর ‘বর্বরতা’ ও ‘সভ্যতা’র দূরত্ব আর মাপতে চাই না। মাপতে চাই না লক্ষ্মীছাড়া দীনতার আবর্জনার ভগ্নস্তুপে শক্তিরূপ সভ্যতার বিগত চৌদ্দ মাসের বর্বরতা, শুধু চাই মুক্তিরূপ সভ্যতার আদি উলঙ্গ সমাজের সততা ও সরলতা।কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ না হোক, আগামীকাল উত্থাপিত হবেই,-সংবিধান বিদ্যমান থাকা সত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের সনদ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক আদেশ আদালতে গেলে টিকবে তো !

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক। সাবেক এমডি, টাকশাল]

সম্প্রতি

আরও খবর