রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

সম্পর্কিত সংবাদ

দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে উল্টো পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশে চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। সংস্থাটির অনুমিত হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষে দারিদ্র্যের হার হতে পারে ২১ শতাংশের কিছু বেশি। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো বিভিন্ন আঘাতের কারণে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

গত এক বছরে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার ফলে প্রায় এক লাখ ১৯ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে এসব বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। শুধু গাজীপুরেই গত ১০ মাসে ৪১টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে

২০২২ সালের বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ।

দেশে দারিদ্র্যের হার হিসাব করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির খানা আয়-ব্যয় জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ করা হয়েছিল ২০২২ সালে। তখন সার্বিক দারিদ্র্য হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক এ তথ্য উল্লেখ করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সময়ে চরম দারিদ্র্য ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ-যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ-অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আবারও দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধির সুফল বেশি পেয়েছে ধনী মানুষ; ফলে আয়-বৈষম্য বেড়ে গেছে।

বর্তমানে দেশে দারিদ্র্য বাড়ার কারণ হলো-

১) প্রবৃদ্ধির সুফল মূলত ধনীরা পেয়েছেন; বেড়েছে আয়-বৈষম্য।

২) শহরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি একেবারে স্থবির হয়ে গেছে।

৩) তরুণদের প্রায় অর্ধেক কম মজুরিতে কাজ করছেন।

৪) সরকার যে ভর্তুকি দেয়, তার সিংহভাগ অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো পায়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সময়কালে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করেছিল; ফলে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে। তাছাড়া সেই সময়ে আরও ৯০ লাখ মানুষ অতিদারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে মধ্যদরিদ্র হয়। তাদের জীবনমানে উন্নতি হয়; বিদ্যুৎ, শিক্ষা, পয়োনিষ্কাশনসহ জরুরি সেবাগুলো পাওয়া সহজ হয়েছিল। তবে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণগুলোর একটি হলো-

১) কর্মসংস্থানের অভাব ও কম মজুরি

এটি আর্থিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, গত এক বছরে ৩৫৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার ফলে প্রায় এক লাখ ১৯ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে এসব বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। শুধু গাজীপুরেই গত ১০ মাসে ৪১টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে।

২) পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের কৃষি ও পল্লী অর্থায়ন বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের কৃষি ঋণ কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে মোট কৃষিঋণ বিতরণ আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে-যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২৫৯ কোটি ১১ লাখ টাকা।

প্রথম ছয় মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগের বছরের তুলনায় ৬৭ শতাংশ কম কৃষি ঋণ বিতরণ করে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কমায় এক-পঞ্চমাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণ কমিয়েছে সাড়ে সাত শতাংশ।

২০২৪ সালের আগে কৃষি খাতে বিশেষ সুদহার থাকলেও সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়। ফলে বড় শিল্পগ্রুপের তুলনায় কৃষকদের বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু পণ্যের দাম কম পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। বাধ্য হয়ে কৃষকরা এনজিও ঋণ নিচ্ছেন, যা পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকে পুঁজি হারাচ্ছেন।

ব্যাংক-সূত্র জানায়, এবার কৃষকদের জন্য আলাদা কোনো সুদহার নির্ধারণ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে অন্যান্য ঋণের মতো একই সুদহার আরোপ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের বেশি সুদ দিতে হচ্ছে, কারণ বড় ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ায় সুদের হার কমে যায়। অপরদিকে কৃষকদের ছোট অঙ্কের ঋণ ও পর্যাপ্ত গ্যারান্টি না থাকায় বেশি সুদ দিতে হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বেকারত্ব বাড়ছে এবং দারিদ্র্য বাড়ছে।

৩) উচ্চ মূল্যস্ফীতি

মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতি আবার বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ-আগস্টের ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

দারিদ্র্য কমাতে যেসব পদক্ষেপ জরুরি:

১) কর্মসংস্থান সৃষ্টি

২) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ

৩) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার

৪) সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা

এই কৌশলগুলো অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। তাই দারিদ্র্য বাড়ছে।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সম্প্রতি

আরও খবর