শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়ঋণ অবলোপনের প্রভাব

ঋণ অবলোপনের প্রভাব

সম্পর্কিত সংবাদ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি খারাপ সংস্কৃতি হলো ঋণ অবলোপন। এই নিয়মের কারণে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ধস নেমেছে। যদিও ঋণ অবলোপন দায়মুক্তি নয়, তবে এটি অনেকটা দায়মুক্তির মতোই মনে হয়। ঋণ অবলোপন একটি ক্ষতিকর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কোনো খেলাপি বা আদায় অযোগ্য ঋণকে ব্যাংকের আর্থিক হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়। ব্যাংক দাবি করে, এতে তাদের আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বাড়ে। তবে এর মধ্যেও ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।

অবলোপনের ক্ষেত্রে ১০০% প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক, যা খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে-তবে কেবল খাতার হিসাবেই, বাস্তবে নয়। এটি একটি অপকৌশল, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আদায় করা কঠিন এমন ঋণকে হিসাবের খাতা থেকে মুছে ফেলে। এর মানে এই নয় যে ঋণগ্রহীতার দেনা শেষ হয়ে গেছে। ব্যাংক চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে, তবে হিসাবের খাতায় তা আর খেলাপি হিসেবে দেখা যায় না। এই প্রক্রিয়ার কারণে ব্যাংকাররা দুর্নীতির সুযোগ পায়। কারণ, ঋণ বিতরণে যে ভুল হয়েছিল, তা অবলোপনের মাধ্যমে দায়মুক্ত হয়ে যায়।

খেলাপি ঋণ হলো যখন ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন। তখন ঋণটি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অবলোপনের আগে ব্যাংককে সেই ঋণের সমপরিমাণ টাকা সঞ্চিতি হিসেবে রাখার নিয়ম আছে, যা একটি আর্থিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য হয়। প্রভিশন রাখার পর, ব্যাংকগুলো আদায়ের সম্ভাবনা কম এমন ঋণকে তাদের ব্যালান্স শিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেয়।

খেলাপি ঋণ অবলোপনের শর্ত হলো: খেলাপি হওয়ার দুই বছর পর ঋণ অবলোপন করা যায়; পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন।

বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি বা অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে অবলোপনের কাজ করা হয়। ঋণ অবলোপন নীতিমালা হলো খেলাপি ঋণকে ব্যাংকের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ঋণ যদি টানা দুই বছর ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ খেলাপি থাকে, তবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে তা অবলোপন করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ অবলোপনের শর্ত শিথিল করে নতুন নীতিমালা জারি করেছে। ফলে আগের তুলনায় সহজে ঋণ অবলোপন করা হচ্ছে। এর প্রভাব হলো ব্যাংকাররা ঋণ আদায়ে উদাসীন হয়ে পড়ছেন, ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকায়। ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়। এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে, যার পরিমাণ ৩ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা।

দেশে সর্বশেষ জুন মাসে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ২৭.৯ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক চতুর্থাংশ ইতিমধ্যেই খেলাপি হয়ে গেছে। মার্চের শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৪.১৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণও অনেক বেশি। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৮১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালে এটি ছিল ৩৮ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী খেলাপি ঋণ প্রায় ৬.৫ লাখ কোটি টাকা, আর অবলোপনকৃত ঋণ অর্ধ লাখ কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেমন ঢাকা মেইল ও যুগান্তর জানায়, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের অবলোপনকৃত ঋণ ৮১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা সীমিত কারণ দেশসেরা বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন। ফলে অবলোপন বা খেলাপি ঋণের আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম। প্রশ্ন হলো, যখন ঋণ দেওয়া হয়েছিল, তখন ব্যাংকরা বন্ধকীয় সম্পত্তির হিসাব কীভাবে করেছেন? কেন সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায় করা যাচ্ছে না? উদাহরণস্বরূপ, একজন প্রান্তিক কৃষক তার একর ফসলি জমি দলিল জমা দিয়ে মাত্র এক লাখ টাকা ঋণ পান। জমির মূল্য ৫০ লাখ টাকা হলেও তিনি সীমিত ঋণ পান। তবে বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের ক্ষেত্রে এমন কঠোর নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপি হওয়ার হার অনেক কম। ব্যাংক কখনোই তাদের ঋণ অবলোপন করে না, কিন্তু ঋণ নিতে গেলে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। কৃষকরা দেশের শ্রেষ্ঠ ঋণগ্রহীতা, কারণ তারা খেলাপি হয় না এবং ঋণ অবলোপন হয় না। তাই তাদের বিশেষ সম্মান দেওয়া উচিত।

[লেখক:উন্নয়নকর্মী]

সম্প্রতি

আরও খবর