বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত গত কয়েক দশকে নানা উদ্যোগ, উন্নয়ন প্রকল্প, নীতিমালা পরিবর্তন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। নতুন হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কমিউনিটি ক্লিনিক-সব মিলিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, রোগীর ভোগান্তি কমেনি; অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, তথ্যের অস্পষ্টতা, অগোছালো প্রশাসন, অতিরিক্ত খরচ এবং অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা রোগীর আস্থাকে নড়বড়ে করে তুলেছে। সীমিত জনবল ও অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে চিকিৎসকরাও মানবিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল রোগ নিরাময়ের পরিসরে সীমাবদ্ধ না থেকে এক ধরনের সামাজিক আস্থা সংকটে রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত গত কয়েক দশকে নানা উদ্যোগ, উন্নয়ন প্রকল্প, নীতিমালা পরিবর্তন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। নতুন হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কমিউনিটি ক্লিনিক-সব মিলিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, রোগীর ভোগান্তি কমেনি; অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েছে
দেশে চিকিৎসার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে; জরুরি সেবা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর রোগীর চাপ অত্যধিক। একই সঙ্গে এ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদের চাহিদাও বাড়ছে। তবে সব ক্ষেত্রেই মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও নিরাপত্তার ঘাটতি স্পষ্ট, যা সেবার গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সরকারি হাসপাতালে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে চিকিৎসকের দেখা-এগুলো এখন নিত্যদিনের চিত্র। টিকিট পেলেও কোন বিভাগে যেতে হবে, কোন চিকিৎসক কখন পাওয়া যাবে-এ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে। অনেক হাসপাতালে কার্যকর তথ্য ডেস্ক বা স্পষ্ট নির্দেশনা নেই; জরুরি বিভাগেও একই ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। বেসরকারি হাসপাতালে ভিন্ন সংকট-খরচের অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত বিল এবং প্যাকেজভিত্তিক বাণিজ্যিক মনোভাব রোগীর মানসিক চাপ বাড়ায়। যেখানে সেবা সহজলভ্য হওয়ার কথা, সেখানে অতিরিক্ত ব্যয় রোগীকে অসহায় করে তোলে।
বাংলাদেশে চিকিৎসক-রোগী অনুপাত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানের তুলনায় কম। একজন চিকিৎসককে দিনে শতাধিক রোগী দেখতে হয়। তিন থেকে পাঁচ মিনিটে রোগীর সমস্যা শোনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ব্যাখ্যা করা এবং চিকিৎসা দেওয়া বাস্তবে অসম্ভব। রোগী মনে করেন চিকিৎসক সময় দেন না; চিকিৎসক মনে করেন ভিড়ের মধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। এই দ্বন্দ্ব থেকেই ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থাহীনতা জন্ম নেয়।
পরিচ্ছন্নতা ও সরঞ্জামের সংকটও গুরুতর। অনেক সরকারি হাসপাতালে বেডের অভাব, নোংরা করিডোর, অপর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও ভাঙাচোরা যন্ত্রপাতি রোগীর নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে। আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার ও ডায়ালাইসিস ইউনিটে যেখানে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন, সেখানেও ঘাটতি চোখে পড়ে। উপ-জেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও দুর্বল; কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই।
এ্যালোপ্যাথি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও অতিরিক্ত পরীক্ষা, কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মনোভাব এবং মানবিক যোগাযোগের ঘাটতি রোগীর আস্থাকে ক্ষুণœ করে। হোমিওপ্যাথি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা শক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দেয়; নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে এটি সাধারণত নিরাপদ ও কার্যকর হলেও অনভিজ্ঞতার কারণে ভুল ডোজ বা নকল ওষুধ রোগীর ক্ষতি করতে পারে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদ প্রাচীন ও কার্যকর বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে পরিচিত, তবে হারবাল ওষুধের মান যাচাই, নিবন্ধনহীন চিকিৎসক, ভেজাল ও গবেষণার ঘাটতি-এসব কারণে রোগীর প্রত্যাশিত ফলাফল নাও মিলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও ক্লিনিকাল গবেষণা অপরিহার্য।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। কোথাও বিকল্প চিকিৎসক আধুনিক পরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করেন, আবার কোথাও আধুনিক চিকিৎসক ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিকে অগ্রাহ্য করেন। এর ফলে রোগী বিভ্রান্ত হন, ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ে এবং আস্থা আরও ক্ষয়ে যায়। প্রশাসনিক দুর্বলতা এই সংকটকে তীব্র করে তোলে। দক্ষ ব্যবস্থাপকের অভাব, দালালচক্র, অদক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা স্বাস্থ্যসেবাকে বাধাগ্রস্ত করে; দুর্বল স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে।
আস্থা পুনর্গঠনে রোগীবান্ধব তথ্যসেবা অপরিহার্য। কার্যকর তথ্য ডেস্ক, ডিজিটাল বোর্ড, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও বিভাগভিত্তিক স্পষ্ট নির্দেশনা রোগীর ভোগান্তি কমাতে পারে। চিকিৎসকের সময় নিশ্চিত করতে জনবল বৃদ্ধি, সহকারী চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। নকল ওষুধ বন্ধ, নিবন্ধনহীন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা জোরদার করা এবং রেফারেলভিত্তিক সমন্বিত স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ ওয়াশরুম ও পর্যাপ্ত সেফটি কিট নিশ্চিত করা দরকার। সর্বোপরি মানবিক যোগাযোগ-রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা-চিকিৎসার সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতকে টেকসই করতে দক্ষ ব্যয়সহ বাজেট বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং গ্রাম ও উপজেলায় সেবা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদ-সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, মান যাচাই ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা কোনো বাণিজ্য নয়; এটি জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও মানবিক অঙ্গীকার। মানুষ, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধকে স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে পারলেই রোগীর আস্থা পুনঃস্থাপন সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে নিরাপদ, মানবিক ও দায়িত্বশীল।
[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]



