ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক দখল, অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো ঘটনা ঘটেছে। লাগামহীন খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুশাসনের অভাব এই খাতকে কার্যত নড়বড়ে করে তুলেছে। হাতেগোনা কিছু ব্যবসায়ীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ার ফলে খেলাপি ঋণ কমেনি। বরং ব্যাংকগুলো এই নীতির বাস্তবায়নে অনাগ্রহী এবং দায় এড়িয়ে চলেছে-এমন অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকের আমানত ঝুঁকিতে পড়ছে এবং আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে।
ব্যাংক হিসাব তলবের কারণে অনেক ব্যবসায়ী বিনিয়োগ স্থগিত করেছেন। নতুন ব্যবসা ও সম্প্রসারণে অনীহার ফলে এলসি খোলা, কাঁচামাল আমদানি এবং বেতন পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বেড়েছে বাজেট ঘাটতি। আর্থিক স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, রাজস্ব ক্ষতি বেড়েছে এবং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। দীর্ঘদিনের এই গভীর সংকট ২০২৫ সালে এসে চূড়ান্তভাবে প্রকাশ পায়। ফলে বছরটি সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বছরজুড়ে নানামুখী সংস্কার উদ্যোগ, কঠোর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেয়া হলেও ব্যাংকিং খাত এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি।
খেলাপি ঋণ: দায় কার?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণের ভারে নুয়ে আছে। স্বাধীনতার পর নানা সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ নেয়া হলেও এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং সময়ের সঙ্গে এর বিস্তার ও রূপ বদলে আজ তা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি-উভয় ধরনের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের চাপ বেড়েছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং সময় বাড়ানোর সংস্কৃতি খেলাপি ঋণ কমানোর বদলে সমস্যা আরও জটিল করেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা কমেছে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে, তার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন খেলাপি। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রয়োগ করায় খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আগে যেসব ঋণ পরিশোধ না হওয়া সত্ত্বেও কাগজে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হতো, সেগুলো এখন মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রভাব ও সুবিধার মাধ্যমে বিতরণ করা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগুলো একে একে প্রকাশ পাচ্ছে এবং মন্দ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ সমস্যার মূল কারণ হলো ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং দুর্বল আইনি কাঠামো। এসব সমস্যা সমাধান না করলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।
ব্যাংক একীভূতকরণ: ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, আমানতকারীরা বিপাকে
২০২৫ সালে দুর্বল ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিতে জোর দেয়। উদ্দেশ্য ছিল অকার্যকর ও দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা দেয়া এবং খাতজুড়ে আস্থার সংকট কমানো। যদিও এই উদ্যোগ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। অনেকের মতে, দুর্বল ব্যাংকের দায় শক্তিশালী ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দিলে পুরো খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি, বিকল্প পথ না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
গত সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে ডজনখানেক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়। এসব অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির চাপে ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে গভীর সংকটে পড়ে। এর মধ্যে সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংক একত্রিত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাঁচটি ব্যাংক হলো-এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। নতুন বছরের শুরুতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। এটি দেশের সরকারি মালিকানাধীন সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক, যার পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বাজেট থেকে দিয়েছে।
বছরজুড়ে জমানো অর্থ ফেরতের আশায় ছিলেন পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা। তারল্য সংকট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলনে দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। ফলে গ্রাহকরা চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনেও কষ্টার্জিত সঞ্চয় তুলতে পারেননি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বারবার আশ্বাস সত্ত্বেও দ্রুত সমাধান না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও আস্থাহীনতা বাড়ে। সর্বশেষ গভর্নর জানান, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া হবে।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একদিকে গভীর সংকটের বছর, অন্যদিকে সংস্কার ও পুনর্গঠনের সূচনাকাল। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা পুরো অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। বিধ্বস্ত এই খাতকে টেনে তুলতে নেয়া উদ্যোগগুলো যদি ধারাবাহিক, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল ও আস্থাভাজন ব্যাংকিং খাত গড়ে ওঠার আশা করা যায়। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার উদ্যোগ।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]



