গ্যাবি হিন্সলিফ রচিত ‘হোয়াই ইজ ট্রাম্প ইন্টারেস্টেড ইন গ্রিনল্যান্ড? লুক টু দ্যা থয়িং আর্কটিক আইস’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মূলত এই প্রবন্ধটি পাঠের মধ্য দিয়েই যে উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ সামনে এসেছে, তা-ই আমার আজকের লেখার উপজীব্য। আরও এক সপ্তাহ, আরও এক অচেনা আবহাওয়াজনিত ঘটনা। কখনো ‘ওয়েদার বোমা’ নামে পরিচিত তীব্র ঝড় ও তুষারপাতের আশঙ্কায় ইউরোপ প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার একই সময়ে আর্কটিকে দেখা দিচ্ছে উষ্ণতার উল্টো অভিঘাত। অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তুষারের বদলে সেখানে বাড়ছে বৃষ্টি, যা পরে জমে কঠিন বরফে পরিণত হচ্ছে—এমন বরফ, যা খুর দিয়ে খুঁড়ে খাবার বের করা রেইনডিয়ারদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। আর্কটিকের মতো চরম পরিবেশে, যেখানে টিকে থাকা নির্ভর করে সূক্ষ¥ অভিযোজনের ওপর, আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও সৃষ্টি করে বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া। আর এই প্রতিক্রিয়া শুধু প্রাণিকুলেই সীমাবদ্ধ নয়; এর অভিঘাত পৌঁছে যাচ্ছে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেও।
দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বনেতারা ‘জলবায়ু যুদ্ধ’-এর সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন—খরা, বন্যা, দাবানল ও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে মানুষের বাস্তুচ্যুতি, সম্পদের সংকট এবং সীমান্তজুড়ে সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে। কিন্তু অনেকেই ভেবেছিলেন, এসব সংকট ঘটবে ইউরোপের বাইরে—দূরবর্তী মরুভূমিতে কিংবা ধীরে ধীরে সাগরে তলিয়ে যাওয়া দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে। সেই ধারণায় সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চিড় ধরিয়েছে হোয়াইট হাউসের গ্রিনল্যান্ডকেন্দ্রিক বক্তব্য। এটি যেন একটি নির্মম স্মরণবার্তা—জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, কিংবা দূরের কোনো ভূখ-ের সমস্যা নয়।
ব্রিটেনের ফার্স্ট সি লর্ড জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তরের বরফ গলতে শুরু করায় আর্কটিক অঞ্চল এখন সম্পদ, ভূখ- এবং আটলান্টিক মহাসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার নিয়ে এক তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই হুমকির মাত্রা বুঝতে হলে প্রচলিত মানচিত্র নয়, বরং পৃথিবীর গ্লোবের উপরের দিক থেকে বিশ্বকে দেখতে হবে।
পূর্বাভাস বলছে, ২০৪০-এর দশকের শুরুতেই উত্তর মেরুর আশপাশের জলরাশি—যা রাশিয়া, কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডকে আলাদা করে রেখেছে—গ্রীষ্মকালে প্রায় বরফমুক্ত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার একটি নতুন সামুদ্রিক পথ উন্মুক্ত হবে—পৃথিবীর মধ্যভাগ ঘুরে নয়, বরং তার মাথার ওপর দিয়ে। এই পথ বাণিজ্য, নৌপরিবহন ও মৎস্য আহরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও একই সঙ্গে খুলে দেবে সামরিক চলাচল ও আক্রমণের নতুন রুট।
এই বরফগলার নিচ থেকেই জন্ম নিচ্ছে সংঘাতের এক নতুন রণক্ষেত্র। চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন পরাশক্তিই আর্কটিকে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়। উত্তরের এই অঞ্চল ক্রমেই পরিণত হচ্ছে এক স্বৈরতান্ত্রিক দাবার বোর্ডে, যেখানে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা কিংবা নরওয়ের স্বালবার্ডের মতো ভূখ-গুলো হয়ে উঠছে কৌশলগত গুটি—নিজেদের চেয়ে বড় শক্তির খেলায় আটকে পড়া একেকটি অঞ্চল।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, এবং ডেনমার্ক স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে—প্রয়োজনে আরও সেনা মোতায়েনেও তাদের আপত্তি নেই। তবু মালিকানার সঙ্গে যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো ভূগর্ভস্থ সম্পদের ওপর সরাসরি অধিকার। বরফ গলতে থাকলে গ্রিনল্যান্ডের নিচে লুকিয়ে থাকা বিপুল সম্পদ—তেল, গ্যাস এবং বিশেষ করে বিরল পৃথিবী উপাদান—ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
এই বিরল খনিজগুলো আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি থেকে শুরু করে ডেটাসেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসেসর—সবকিছুতেই এগুলোর প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এগুলো চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় জয়ের জন্য ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা একসময় ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে রাবার বা তুলা। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অভিযোগ—গ্রিনল্যান্ডে ‘চীনা ও রুশ জাহাজে ভরে গেছে’—ইঙ্গিত দেয়, সম্ভাব্য এই সম্পদভা-ারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগেভাগে প্রবেশ ঠেকানোই তার মূল উদ্বেগ।
ব্রিটিশ দৃষ্টিতে এসব পদক্ষেপ নতুন সাম্রাজ্যবাদের মতো মনে হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর একটি ভিন্ন পাঠও রয়েছে। ‘মাগা’ সমর্থকদের কাছে এটি আমেরিকার ঐতিহাসিক বিস্তারের ধারাবাহিকতা—সীমান্ত পেরিয়ে সুযোগের সন্ধান, সম্পদ আহরণ এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার গল্প। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্য আক্রমণ নয়, বরং কেনা বা একচেটিয়া সামরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। তবু এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মাত্র এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের সম্পর্ক কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্পের অস্থির রাজনৈতিক মনোযোগের কারণে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি হয়তো আগ্রহ হারিয়ে অন্য ইস্যুতে মন দেবেন, কিংবা স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা উসকে দেয়ার কৌশল নেয়া হতে পারে—যার শেষে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে উপস্থাপন করবে এক ‘রক্ষাকর্তা’ শক্তি হিসেবে।
তবে যেভাবেই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানচিত্র বদলাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য। এই সংঘাতগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে এক নতুন বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা, যারা ইতোমধ্যেই টিকে থাকার প্রান্তে- দরিদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, খরাকবলিত জনপদ কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় অক্ষম সমাজগুলো।
সমন্বিত বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার সাম্প্রতিক ঘোষণা মনে করিয়ে দেয়—জাতীয় স্বার্থের প্রতিযোগিতাই এখনো বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি ভূখ- নয়; এটি এক সতর্ক সংকেত—জলবায়ু সংকটের ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি আমরা এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারিনি। তবু তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে সীমিত করা ও এর প্রভাব কমাতে আমরা যা কিছু এখনো করতে পারি, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষত যখন ইতোমধ্যেই সংঘটিত ক্ষতির সবটাই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
[লেখক: আইনজীবী]



