Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

সম্পর্কিত সংবাদ

শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে একজন শিক্ষকের ন্যূনতম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। প্রথমটি হলো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (সেইফ গার্ডিং), দ্বিতীয়টি হলো শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক কল্যাণে সজাগ ও সহানুভূতিশীল থেকে তাকে সাহায্য করা (পাস্টোরাল কেয়ার), এবং তৃতীয়টি হলো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত চাহিদা ও সম্ভাবনার প্রতি সংবেদনশীল থেকে শেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (টিচিং)।

একজন শিক্ষক কেবল তথ্যের বাহক নন; তিনি

হলেন বিবেকের দীপশিখা। সেই আলো নিভে গেলে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায় আর সেই দায় কার, তা নির্ধারণের জন্য খুব বেশি দূরে তাকাতে হয় না।

তাকাতে হয় কেবল আয়নায়

এই দায়িত্বগুলো কোনো যান্ত্রিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতালিকার অংশ নয়; বরং তারা একটি অন্তর্গত নৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ, যার প্রথম দুটির অনুপস্থিতি শেষেরটির কার্যকারিতা ও বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই তিনটি দায়িত্ব একত্রে সামগ্রিক শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপন করে। শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কেবল শারীরিক সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি তার মানসিক নিরাপত্তা, পরিচয়ের স্বীকৃতি ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানকেও নিশ্চিত করাকে বোঝায়। যেখানেই এই নিরাপত্তা ব্যাহত হয়, সেখানেই শেখার পরিবেশে বিষ ছড়িয়ে পড়ে। আবার শিক্ষার্থীর সামাজিক-আবেগিক কল্যাণের প্রতি শিক্ষক যদি নিস্পৃহ থাকেন, কিংবা তার মধ্যে সহানুভূতির অভাব দেখা দেয়, তবে শিক্ষাদান নিছক তথ্য পরিবেশনের একপেশে প্রয়াসে পরিণত হয়, যার মধ্যে জীবন গঠনের আকাক্সক্ষা ও অনুপ্রেরণা অনুপস্থিত থাকে। প্রখ্যাত ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নিপীড়িতের শিক্ষা’ (প্যাডাগোজি অব দ্য অপ্রেসড)-এ বলেছিলেন, ‘পরিচয়ের অনুভূতি ছাড়া, মুক্তির জন্য প্রকৃত সংগ্রাম হতে পারে না’। একজন শিক্ষকের যদি শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা না থাকে, তবে তার শিক্ষা চর্চা শুধুই প্রভুত্বমূলক হয়ে ওঠে, মুক্তি বা স্বাধীনতার নয়। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শিক্ষকের নৈতিক অবস্থান তার মানবিক প্রতিশ্রুতি দ্বারা নির্ধারিত হয়। তিনি কেবল পাঠদান করেন না, বরং একেকজন শিক্ষার্থীর জীবনে নীরব অভিভাবকের মতো উপস্থিত থাকেন, বিশেষ করে একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক ও সহযাত্রী হিসেবে। তাই, শিক্ষকতার এই তিনটি মৌলিক দায়িত্বের যে কোনো একটি অবহেলার অর্থ শিক্ষক হিসেবে শুধু পেশাগত ব্যর্থতা নয়, বরং নৈতিক বৈকল্যও বটে। যেখানে নৈতিক দায়বদ্ধতা অনুপস্থিত, সেখানে শিক্ষা নয়, বরং ক্ষমতার অনুশীলনই মুখ্য হয়ে ওঠে।

শিক্ষকতার প্রকৃত মূল্যবোধ তাই নির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে যে, আমি আমার ছাত্রের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য কতটা দায় অনুভব করি? শিক্ষকের দায়িত্ব কখনোই কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে বিস্তৃত এক মানবিক জগতেও তার দায়িত্বের পরিধি প্রসারিত হয়। পাঠদান শিক্ষকতার একটি মৌলিক উপাদান হলেও, তা কেবল বাহ্যিক কাঠামোর দৃশ্যমান কর্মকা-। অন্তরের পরিসরে, একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন এক ‘নিরাপদ মানুষ’ ও আশ্রয়স্থল; যার উপস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থী নিজের অস্তিত্ব, কৌতূহল, ভুল এবং স্বপ্ন নিয়ে নির্ভয়ে আশ্রয় নিতে পারে। এই বিশ্বাস ও নির্ভরতার জগতেই গড়ে ওঠে এক সুস্থ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, যার ভিত্তি শুধুই একতরফা জ্ঞানের স্থানান্তর নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি ও মানবিক সংযোগ। যখন শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের মধ্যে কেবল একজন ‘জ্ঞানদাতা’ নয়, বরং একজন শ্রোতা, একজন সহানুভূতিশীল অভিভাবক, এবং একজন আত্মার দার্শনিক বন্ধুকে আবিষ্কার করে, তখন তার মধ্যে শেখার ইচ্ছা প্রকৃত অর্থেই জাগ্রত হয়। আত্মবিশ্বাসের যে আলো তার মধ্যে তখন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নয়, বরং তার আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক বোধে প্রতিফলিত হয়। সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে ধ্যানে, জ্ঞানে ও মননে এমন এক নাগরিক হিসেবে, যে শুধু নিজের জন্যই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের দিকেও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের অভিমত বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার মতে, সৃজনশীল প্রকাশ এবং জ্ঞানের মধ্যে আনন্দ জাগ্রত করা শিক্ষকের সর্বোচ্চ শিল্প। একজন প্রকৃত শিক্ষক সেই শিল্পী, যিনি কেবল শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক নয়, তার হৃদয় ও কল্পনাশক্তিকেও জাগিয়ে তোলেন। সেই জাগরণেই জন্ম নেয় মুক্ত চিন্তা, ন্যায়বোধ এবং বিবেকের সক্রিয়তা যা একটি সমাজের সজাগ, দায়িত্বশীল ও প্রগতিশীল নাগরিক তৈরির পূর্বশর্ত। শিক্ষকের এই ভূমিকাকে কেউ কেউ ‘অদৃশ্য কারিগর’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ তিনি যে বীজ বপন করেন, তাৎক্ষণিকভাবে তার ফল দৃশ্যমান না হলেও, ভবিষ্যতের একটি ন্যায্য ও মানবিক সমাজ নির্মাণে তার প্রভাব অপরিসীম। এই অদৃশ্য শ্রমের ফলাফল পেতে হয়তো সময় নেয়, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর জীবন যখন আলোর দিকে এগিয়ে যায়, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপেই থাকে তার শিক্ষকের অদৃশ্য ছায়া। তবে এই মূল্যবান কথাগুলো এখন আর কেবল পাঠ্যসূচির অন্তর্গত নীতিনির্দেশ বা শিক্ষকতা সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার সময় নয়। এগুলো অনুসরণ করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা আজ এক কঠোর বাস্তবতা, সময়ের জোরালো দাবি। কারণ আজ যখন আমরা দেখি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা একসময় শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল, তা নানা কারণে নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। যখন কিছু কিছু ঘটনায় শিক্ষকদের নীরবতা, নির্লিপ্ততা বা ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, তখন কেবল কণ্ঠে শিক্ষার মূল্যবোধ জপে যাওয়ায় আর কোনো মুক্তি নেই। প্রয়োজন নতুন করে দায়বদ্ধতার পুনর্মূল্যায়ন, নৈতিক অবস্থানের সাহসী পুনর্নির্মাণ। আজকের দিনে, যখন শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো অভ্যন্তরীণ ন্যায্যতা ও মানবিক আচরণের জায়গায় কখনও ক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখন একজন শিক্ষক হিসেবে চোখ বুজে থাকা মানে শুধু দায়িত্ব এড়ানো নয় বরং তা মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর। নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ থাকা এই পরিস্থিতিতে আসলে এক ধরনের সক্রিয় নীরবতা, যা অন্যায়ের পক্ষে পক্ষপাত তৈরি করে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, সমাজের যেকোনো সংকটকালে শিক্ষকরা ছিলেন মূল্যবোধের ধারক ও বাহক।

প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিস যেমন তরুণদের যুক্তি ও নৈতিক প্রশ্নবোধে জাগ্রত করে আত্মিক মুক্তির পথ তৈরি করেছিলেন, তেমনই ভারতীয় উপমহাদেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শনেও মানবিকতা ছিল শিক্ষা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একথাই শিক্ষা দেয় যে, একজন শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেই দায়িত্ব শেষ করেন না, তিনি সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করেন। আজকের সময়ে এই ভূমিকার পুনরুজ্জীবন একান্ত প্রয়োজন। এখন শিক্ষকতা মানেই শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক নেতৃত্বের দাবিও বহন করা। কারণ শিক্ষকদের অবস্থান একটি সমাজে কেবল বিদ্যাদানের নয়, বরং ন্যায়-অন্যায়, মানবিকতা- পাশবিকতার পার্থক্য শেখানোর অনন্য সুযোগও। এই মুহূর্তে সেই ভূমিকার সাহসী পুনর্নির্মাণ, নতুনভাবে আত্মস্থ করা এবং যথাযোগ্য অনুশীলন একান্ত জরুরি। তা না হলে শিক্ষকতা তার নৈতিক জ্যোতি হারিয়ে ফেলবে, যা একটি জাতির জন্য গভীর অন্ধকার ডেকে আনবে। আপনি যদি শিক্ষক হন, কিংবা নিজেকে শিক্ষক ভাবেন, তাহলে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: আপনি কি সত্যিই আপনার পেশাগত জীবনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ও অতীতের ঘটনাগুলোর দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন? ভেবেছেন কি, যেসব ঘটনাপরম্পরায় শিক্ষার্থীরা আহত, অবমানিত বা নিপীড়নের শিকার হয়েছে, সেই ঘটনাগুলোর নেপথ্যে আপনি কোথায় ছিলেন? আপনি কি একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, না নিছক একজন দূরদর্শী পর্যবেক্ষক, যিনি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেবল মাথা নেড়ে ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়ে থেকেছেন? আপনি কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল, নাকি নিজের অবস্থান ‘নিরপেক্ষতা’ বলে আড়াল করে নিয়েছিলেন সুবিধাজনক এক নির্লিপ্ততার মধ্যে? যদি এমন কোনো মুহূর্তে আপনি এমন এক জায়গায় ছিলেন, যেখানে অন্যায়ের ছায়া দীর্ঘ হয়েছিল, যেখানে কণ্ঠরোধের আতঙ্ক ভর করেছিল, অথচ আপনি চুপ থেকেছেন তাহলে আপনাকে শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করার আগে, নিজের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়তে হবে। কারণ শিক্ষকতা শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থান, এক ধরনের মূল্যবোধ-ভিত্তিক নাগরিক দায়িত্ব। এই প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক জেমস বোল্ডউইনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যা কিছুর মুখোমুখি হই তার সবকিছুই পরিবর্তন করা যায় না; কিন্তু যতক্ষণ না আমরা কোনোকিছু মোকাবেলা করি, ততক্ষণ কিছুই পরিবর্তন করা যায় না’।

শিক্ষক হলেন তার শিক্ষার্থীদের কাছে জীবন্ত উদাহরণ ও প্রেরণার উৎস। সবকিছু হয়তো একা একজন শিক্ষক বদলে দিতে পারবেন না, কিন্তু অন্যায়ের মুখোমুখি না হয়ে, তাকে উপেক্ষা করে, শিক্ষা কখনোই মুক্তির দিশা দেখাতে পারে না। তখন শিক্ষা হয়ে পড়ে প্রথার চর্চা, আর শিক্ষক হয়ে ওঠেন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী মুখপাত্র যার মধ্যে মানবিকতা, প্রতিবাদ কিংবা নৈতিক অবস্থান বলে কিছুই থাকে না। তাই শিক্ষক হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয়ের পরীক্ষা হয় সংকটের সময়েই।

যে শিক্ষক অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন না, শিক্ষার্থীর যন্ত্রণার ভাষা শুনতে পারেন না, অথবা প্রতিষ্ঠানিক স্বার্থরক্ষার মোড়কে মৌনতার আশ্রয় নেন, তিনি শিক্ষা নামক পবিত্র দায়িত্বের বিপরীতে আত্মসমর্পণ করেন ক্ষমতার কাছে কিংবা নিজের স্বার্থে কাছে। ফলে তাকে নিজের পরিচয়, নিজের ভূমিকা ও নিজের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন করতেই হবে। নইলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেগে ওঠা ‘শিক্ষার ওপর বিশ্বাস’ নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষক কেবল তথ্যের বাহক নন; তিনি হলেন বিবেকের দীপশিখা। সেই আলো নিভে গেলে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায় আর সেই দায় কার, তা নির্ধারণের জন্য খুব বেশি দূরে তাকাতে হয় না। তাকাতে হয় কেবল আয়নায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি একটি আদর্শিক অবস্থান, এক গভীর মানবিক অঙ্গীকার। এটি এমন কোনো পেশাগত পথ নয়, যেখানে কেবল নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে দায়িত্ব শেষ হয়। বরং এটি এমন এক অভিযাত্রা, যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের মনের দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে জাগিয়ে তোলে, এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের বীজ বপন করে। শিক্ষকতা মানে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়; এর অর্থজীবন সম্পর্কে পড়ানো তথা আত্মমর্যাদা, সংবেদনশীলতা ও বিবেকের পাঠ শেখানো। এখানে প্রতিটি পাঠের অন্তরালে থাকে মানবিকতা, প্রতিটি উত্তরের অন্তর্নিহিত থাকে প্রশ্ন করার সাহস, আর প্রতিটি সংলাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের ন্যায়পরায়ণ নাগরিক গড়ার প্রেরণা। যে শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষায় পাস করাতে চান, তিনি শিক্ষকতার বাইরের খোলসটাকে ছুঁয়ে যান মাত্র। কিন্তু যিনি তাদের মনে প্রশ্ন জাগাতে চান, তাদের হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে চান, তাদের আত্মায় মানবিকতার বীজ রোপণ করতে চান তিনিই তো প্রকৃত শিক্ষক। শিক্ষকতার এই পেশাগত শিক্ষাদর্শনের রূপকাররা ইতিহাসে অগণিত। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার কবিতায় বলেছিলেন, ‘শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষা নয়, শিক্ষা মানে যুদ্ধ’। এ যুদ্ধ অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষকে একটি মুক্ত আলোচনার মঞ্চে পরিণত করেন, যেখানে ছাত্র শুধু শুনতে, বলতে, পড়তে ও লিখতে শিখে না, সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে শেখে; শুধু বোঝে না, প্রশ্ন তোলে; শুধু অনুসরণ করে না, নিজ উদ্যোগে পথ খুঁজে নেয়। এইভাবে শিক্ষকতা হয়ে ওঠে এক মহৎ প্রতিশ্রুতি যা শুধু বিদ্যাদানের নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াবার প্রতিশ্রুতি। একজন শিক্ষক তার নিজের অস্তিত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখান কীভাবে সবলের বিপরীতে দুর্বলের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে নিজের কণ্ঠকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সজীব রাখতে হয়, কীভাবে নিপীড়নের মুখেও মানবিক অটলতা ধরে রাখতে হয়। এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্তিগত ঝুঁকির মধ্যেও আদর্শকে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়; এটিই শিক্ষকতার মর্মবস্তু। বর্তমান সময়ের অস্থির, বৈষম্যপূর্ণ সমাজে, যেখানে তথ্যের আধিক্য আছে কিন্তু নীতির সংকট প্রকট, সেখানে একজন শিক্ষক তার বিবেক, সাহস ও সহানুভূতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শুধু পথ দেখান না, শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি হয়ে ওঠেন আলো বহনকারী, নীরব বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী।

(চলবে)

[লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

সম্প্রতি

আরও খবর