Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

সম্পর্কিত সংবাদ

বিশ্ব ইতিহাসে ‘শান্তি’ ছিল মানুষের চিরন্তন আকাক্সক্ষা। কিন্তু আজকের বিশ্বে শান্তির প্রকৃত অর্থ কি আগের মতোই নিখুঁত ও পরিষ্কার? নাকি এটি রাজনৈতিক কৌশল ও কূটনীতির ছদ্মবেশ মাত্র?

একটা রাষ্ট্র ধ্বংস করে, হাজারো প্রাণ নিঃশেষ করে কেউ যখন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শান্তির কথা বলেন, তখনই যেন তার নামে নোবেল শান্তি পুরস্কারের রিজার্ভেশন হয়ে যায়।

শান্তিকে শুধু বক্তৃতার বা পুরস্কারের বিষয় হিসেবে না দেখে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শান্তির নামে যে রাজনৈতিক মুখোশগুলো তৈরি হচ্ছে, তা চিনে নিতে হবে। কারণ শান্তি কখনও পুরস্কার কিংবা খ্যাতির মাধ্যমে অর্জিত হয় না, বরং মানুষের জীবনে শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আসে

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই পুরস্কার এখন যেন একরকম ‘রাজনৈতিক ব্রন্ডিং টুল’; যাতে অতীত ঢেকে যায়, বর্তমান থেমে যায়, ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে করতালির দৃশ্যপট।

আজকাল শান্তির নামে এক ধরনের রাজনীতিক নাটক মঞ্চস্থ হয়। পুরস্কারটি হয়ে গেছে এক ‘পলিটিক্যাল আইটেম সং’- চরিত্রের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চেহারা, কর্মের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বক্তৃতা। নোবেল বিজয়ী মানেই তিনি মানবতার দূত- এই ধারণাটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ আমরা দেখছি, অনেকেই এই পুরস্কার পেয়েছেন, যারা মানবাধিকারের ধারক-বাহক তো ননই, বরং কখনও কখনও ছিলেন তার লঙ্ঘনকারী। এমনকি যারা আগুন লাগিয়েছে, তারাই পানি ছিটিয়ে নোবেল পেয়েছেন।

বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ মানবতাবাদের স্বীকৃতি হলেও, প্রায়ই এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পুরস্কারটি কখনও কখনও শান্তির নামে রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসানে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন, তখন ব্যাপক বিতর্ক হয়। কারণ তিনি সেই সময় কম্বোডিয়া ও লাওসে গোপনে বোমাবর্ষণের পরিকল্পনাকারী ছিলেন। এ কারণে নোবেল কমিটির দুই সদস্য পদত্যাগ করেন। এটি শান্তির নামে রাজনৈতিক ছদ্মবেশের এক স্পষ্ট উদাহরণ।

২০০৯ সালে মাত্র কিছু মাস ক্ষমতায় আসার পর বারাক ওবামাকে শান্তির নোবেল দেয়া হয়। এ সময় আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান তীব্রতর হচ্ছিল, আর পরবর্তীতে তার প্রশাসন ড্রোন হামলা বাড়ায়। পুরস্কারটি অনেকেই দেখেছেন ভবিষ্যতের ওপর আস্থার এক রাজনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে, যা বাস্তবে পূরণ হয়নি।

মিয়ানমারের অং সান সুচিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য পুরস্কৃত হলেও, রোহিঙ্গা সংকটের সময় তার নীরবতা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। তবুও নোবেল কমিটি তার পুরস্কার প্রত্যাহার করেনি, যা পুরস্কারের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বাংলাদেশের মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষেত্রেও একই দ্বৈততা লক্ষ করা যায়। ২০০৬ সালে তার মাইক্রোক্রেডিট উদ্যোগের জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। এটি ছিল দারিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে পরবর্তীতে তার প্রতিষ্ঠানের ঋণের উচ্চ সুদহার, ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপে থাকার অভিযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা দেয়। অনেকে বলেন, মাইক্রোক্রেডিট ব্যবস্থা সবসময় দারিদ্র দূর করতে পারেনি, বরং কখনও কখনও এটি গরিবদের আর্থিক বোঝা হিসেবে কাজ করেছে। তাছাড়া ইউনূসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষত বিকল্প ক্ষমতা কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা তাকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার ‘নোবেল লরিয়েট’ মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সাম্প্রতিক ইথিওপিয়ার ঘটনাও এই দ্বৈততার নতুন অধ্যায়। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ নোবেল শান্তি পুরস্কার পান ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের শত্রুতা শেষ করার জন্য। বিশ্ব তখন তাকে শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, হাজার হাজার প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এই পরিস্থিতি পুরস্কারের নৈতিকতা ও ব্যবহার সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তোলে।

এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, নোবেল শান্তি পুরস্কার আজ অনেকাংশে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ‘কারেন্সি’ বা ‘পারমিশন স্লিপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি অনেককে রাজনৈতিক সুরক্ষা দেয়, তাদের অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি দেয়। একবার পুরস্কার পেলে, তাদের প্রতি সমালোচনা অনেক সময় দমন হয়ে যায়, কারণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও শক্তিগুলো তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি নৈতিকতার বদলে কৌশল, মিডিয়া ফ্রেমিং ও স্ট্রটেজিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাস্তব শান্তিকর্মীরা যারা নিভৃতে মানবতার সেবায় নিয়োজিত, তাদের স্বীকৃতি প্রায়ই ম্লান হয়ে যায়। শান্তির নামে সাজানো মুখোশ পরিয়ে যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে আসেন, তাদের প্রকৃত কর্মকাণ্ড প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ।

সুতরাং, শান্তিকে শুধু বক্তৃতার বা পুরস্কারের বিষয় হিসেবে না দেখে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শান্তির নামে যে রাজনৈতিক মুখোশগুলো তৈরি হচ্ছে, তা চিনে নিতে হবে। কারণ শান্তি কখনও পুরস্কার কিংবা খ্যাতির মাধ্যমে অর্জিত হয় না, বরং মানুষের জীবনে শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আসে।

আমাদের কাজ হওয়া উচিত সত্যিকারের শান্তিকর্মীদের স্বীকৃতি দেয়া এবং শান্তির নামে রাজনৈতিক কৌশল ও ভণ্ডামি উন্মোচন করা। শান্তির আসল অর্থ হলো সৎ, মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়া, যা কোনো মুখোশ বা প্রহসনের ওপর ভিত্তি করে নয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

সম্প্রতি

আরও খবর