Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

সম্পর্কিত সংবাদ

পৃথিবীব্যাপী ভাঙা-গড়ার খেলা পরিলক্ষিত হয়। আগে যেটা ব্যবহৃত হতো, আজ সেটা পরিত্যক্ত। তাই বলা হয়, ‘নদীর এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এইতো নদীর খেলা।’ এমন প্রবাদ মেনে নিলেও মানুষের মন কেন সহজেই পরিবর্তন হয় না? জেনে-শুনে পুরাতনকে ছুঁড়ে ফেলছি আর নতুনকে গ্রহণ করছি। সমাজে কি ছুঁড়ে ফেলছি, আর কি পরিবর্তন আনছি, আজ তা আলোচনা করে দেখা যাক।

ইতঃপূর্বে প্রভাবশালী ধনী বাবুরা গদিতে বসত, আর টেনে টেনে নিয়ে যেত দলিত-বঞ্চিত মানুষকে; যা এখনও কলকাতায় দেখা যায়, তার নাম- হাতে-বুকে টানা রিকশা। এরপর আসে প্যাডেলওয়ালা, পায়ে টানা ধীরগতিসম্পন্ন রিকশা বা ভ্যান, যা বয়োবৃদ্ধদের জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। এখন আর পায়ে টানা রিকশা-ভ্যান কি আছে? এর স্থান দখল করেছে ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান ও রিকশা। বাংলাদেশে সর্বত্র সড়কে চলছে বিদ্যুৎচালিত এসব যানবাহন। পায়ে টানা ভ্যান বা রিকশার ইতিহাস দরিদ্র অসহায় মানুষের দাসত্বের পরিচয় বহন করে। অনেক গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষ ক্ষুধার্ত পেটে, শারীরিক শক্তির অভাবে, হাতে বা পায়ে টানা যানবাহন চালাতে পারত না।

এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি। এখন ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও রিকশা বৃদ্ধরাও সহজে চালিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। এটা কি পরিবর্তন নয়?

মাটির কুপি, হারিকেন ও হ্যাজাক : গ্রাম-গঞ্জের মানুষ ইতঃপূর্বে সবাই ব্যবহার করত। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত লেখাপড়ার টেবিল, বসতঘর, হাটবাজার- সব জায়গায় চলত মাটির কুপি, হারিকেন ও হ্যাজাক দিয়ে। এগুলোর মধ্যে ব্যবহৃত হতো কেরোসিন তেল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের ফলে আধুনিক যুগে বিদ্যুৎচালিত বাল্ব, বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার হচ্ছে। এটি কি পরিবর্তন নয়? এখন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মানুষ আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছে।

গরু, লাঙল-জোয়াল : এক সময় কৃষকরা ভোর ৫টা থেকে গরু, মহিষ, লাঙল-জোয়াল নিয়ে জমিতে চাষাবাদ করতেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে এর স্থলে এসেছে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার। এখন এক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক বিঘা জমি চাষাবাদ সম্ভব। পান্তা ভাতের পরিবর্তে প্রেসার কুকার বা রাইস কুকার ব্যবহার হয়। আগের দিনে এক বিঘা জমির ধান কাটা একদিনের কাজ ছিল, এখন হারভেস্টার মেশিনে তা কয়েক মিনিটেই সম্ভব। এটি কি পরিবর্তন নয়?

ঢেঁকি : এক সময় গ্রামীণ জনপদে ঢেঁকি ছিল চাল বা চালের গুঁড়া তৈরি করার একমাত্র মাধ্যম। আধুনিক ধান ভাঙার কল ও মেশিন ঢেঁকির স্থান দখল করেছে।

শিলপাটা : আগে রান্নাঘরে মসলা পেষণ হতো শিলপাটায়। আধুনিক যুগে এটি ব্লেন্ডার মেশিনে করা হয়।

মাটির ঘর : গ্রামে মাটির ঘর ছিল সাধারণ। এখন ইটের বাড়ি, কুঁড়েঘরের জায়গায় টিনের বা দালান বাড়ি হয়েছে।

পালকি : গ্রাম বাংলায় পালকি ছিল যাতায়াতের বাহন এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। এখন দ্রুতগামী যানবাহন যেমন- বাস, মাইক্রোবাস, কার, ট্যাক্সি পালকির জায়গা নিয়েছে।

বিয়ের গান : আগে বর-কনের বিয়েতে মেয়েরা বিভিন্ন গীত পরিবেশন করত। এখন সিনেমার দৃশ্য বা রেকর্ডিং গান ব্যবহৃত হয়।

রাস্তাঘাট : গ্রাম-গঞ্জের মানুষ আগে মাটির রাস্তায় চলাফেরা করত। এখন পাকা রাস্তা ও যানবাহনের কারণে চলাচল দ্রুত হয়েছে।

মৃত্যু : আগে মৃত্যুবরণকারীকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হতো। বর্তমানে চিকিৎসা ও আধুনিক প্রক্রিয়ায় এটি পরিবর্তিত হয়েছে।

চড়ক পূজা, নিরক্ষণ, কাঁসার থালায় পা ধোয়া, জমিদার প্রথা, ইট ভাঙা, কাঠের সাঁকো, কোমড়ের বিছা, কাল নাগিনী সাপ, ওঝা ও ঝাড়ফুঁক, হুকা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যক্ষ্মা/কুষ্ঠ/হাম/বসন্ত, রাজা-রানী, মতামত, আইন, সতীদাহ প্রথা, হিন্দু বিধবা বিবাহ, সুর-অসুর ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আইনের কারণে জীবনযাপন ও সামাজিক রীতি বদলেছে।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জীবনধারা, চিন্তাভাবনা, সামাজিক প্রথা ও প্রযুক্তি পরিবর্তিত হয়েছে। অতীতের ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান ও জটিল প্রথা এখন স্বল্প সময় ও সহজে সম্পন্ন হয়। এটি মানব জীবনের উন্নয়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি প্রকাশ করছে।

[লেখক : অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

সম্প্রতি

আরও খবর