Thursday, March 5, 2026
হোমUncategorizedপঁচাত্তর বছরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ

পঁচাত্তর বছরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ

সম্পর্কিত সংবাদ

বিগত পঁচাত্তর বছরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা বলতে হয়, অন্নদাশঙ্কর রায়দের প্রজন্মে বায়োলজিক্যাল অবস্থিতির পর এপার বাংলায় অখ- বাঙালি জাতিসত্তার চর্চা এবং ধারণ- এই বিষয়টি প্রায় শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিশেবে অন্নদাশঙ্করের জীবনাবসানের পর যাঁদের প্রতি খুব গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল; শঙ্খ ঘোষ বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা, তাঁরা যত ওপার বাংলায় নিজেদের ব্যাপ্তির প্রসারে যতœবান ছিলেন, তার ভগ্নাংশ সময় তাঁরা খরচ করেননি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে এপার বাংলার ধারার সেতুবন্ধনের। এই সেতুবন্ধন টাই ছিল অন্নদাশঙ্করের স্বপ্ন।

’৪৭-এর ভারত ভাগের পর সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য-সংস্কৃতির দুনিয়ার সঙ্গে এপার বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের স্বপ্নে অন্নদাশঙ্কর শান্তিনিকেতনে আয়োজন করেছিলেন সাহিত্যমেলা। সেই ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এপারের সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে তেমন একটা দেখা যায়নি। অথচ কি পাকিস্তান আমলে বা পরবর্তীতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টির পর, সেখানকার বাঙালি সমাজ কিন্তু এপারের বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি ঘিরে সব সময়ে উৎসাহী থেকেছে। চর্চা করেছে। সমাদর করেছে।

সোজা পথেই হোক, বাঁকা পথেই হোক চিরকাল বাংলাদেশে এপার বাংলার সৃষ্টি যতটা সহজ লভ্য ছিল, এপার বাংলায় কিন্তু কখনোই তা ছিল না। শঙ্খ-সুনীলেরা নিজেদের বাংলাদেশে নিজেদের ব্যাপ্তিতে যতটা যতœশীল চিরদিন থেকেছেন, তার কণাটুকু সময় তারা খরচ করেননি বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের ঘিরে। কবিদের ঘিরে। শিল্পীদের ঘিরে।

আজ এপার বাংলার স্মরণজিৎ চক্রবর্তী বা ইসমাইল দরবেশ কিংবা ওয়াহিদা খন্দকার তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ওপার বাংলার একটা বড় অংশের মানুষের কাছে পরিচিত, তার ভগ্নাংশ ও শওকত আলী বা আহমদ ছফা (বিশেষ করে তাঁর সাহিত্য) এপারের পাঠকদের কাছে পরিচিত নয়। এই অপরিচয়ের দায় কার? এপারের একটা প্রথম সারির সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক, যিনি লক্ষ লক্ষ টাকা বেতন পেতেন, তিনি নিজের আর্থিক দুরবস্থার গল্প ফেঁদে বাংলাদেশের লেখকদের থেকে (এপারের ও) কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পত্রিকার চাকরি থেকে বিযুক্ত হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু যে দৃষ্টান্ত সে স্থাপন করেছে- সেটা এখন দুই পারের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের একটা প্রচলিত তরিকা হয়ে উঠছে নাকি- এই প্রশ্নটা কানাঘুসো শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।

এই সঙ্কটের উৎস কোথায়? ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অখ- ভারতে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা নিজে এবং বহু বছর ধরে তাঁদের সংস্পর্শে আসা প্রজন্মের যে মূল্যবোধ ছিল- সেই প্রজন্মই এখন জৈবিক কারণে নেই। তাঁদের মূল্যবোধের ধারার ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। কিন্তু সেটা বজায় না থাকার দায় কি কেবলমাত্র এই প্রজন্মের উপরেই বর্তাবে?

সমরেশ বসুর ভাবনা চুরি করে নিজের নামে উপন্যাস ছাপান সমরেশের এক বন্ধু। সমরেশের সঙ্গে সেই বন্ধুর সম্পর্ক ঘিরে যে দূরত্ব- তা ভিতর থেকে কোনও দিন দূর হয়নি। অথচ সেই চৌর্যবৃত্তি করা লোকটিকে একটি সংবাদ মাধ্যম সমালোচনা সাহিত্যের কেষ্টবিষ্টু বানাতে সচেষ্ট ছিল।

এই ধারা এপার বাংলার সংস্কৃতিলোককে ক্রমাগত আচ্ছন্ন করে ফেলছে। মননলোকের গভীরতা আজ ক্রমশ শুকিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে সমাজ মাধ্যম আমাদের প্রবহমান দুনিয়াকে অনেকটা বেশি নিয়ন্ত্রণ যবের থেকে করতে শুরু করেছে, তবে থেকেই সংস্কৃতি দুনিয়াটা কেমন যেন বোধের মাত্রাকে ধীরে ধীরে বিসর্জন দিতে শুরু করেছে।

গত শতকের নয়ের দশকের বাজার অর্থনীতি-বিশ্বায়ন-সামগ্রিকভাবে গোটা বিশ্বের সাংস্কৃতিক চেতনাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতি নিস্তার পায়নি। কিন্তু সমস্ত ধরনের রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার মোকাবিলা করে একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ কিন্তু ঐতিহ্যের মূল থেকে শতফুল ফোটাবার চেষ্টা নিরন্তরভাবে করে গেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই সময়কালের একটা বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গ বামপন্থীদের দ্বারা প্রশাসনিক এবং অনেকটাই সামাজিকভাবে পরিচালিত হলেও বাঙালি সংস্কৃতির অন্বেষণ এবং আনুবীক্ষণিক চর্চা- এই বিষয়টা খুব আন্তরিকভাবে হয় নি।

এই সময়কালে সংস্কৃতিচর্চার জন্যে এপার বাংলায় সরকারের উদ্যোগের কোনও অভাব ছিল না। অকাতরে অর্থ ও সরকার বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্তু সেগুলির বেশিরভাগেরই রূপায়নে শহর কেন্দ্রিক উচ্চ ডিগ্রিধারী লোকদেরই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সংস্কৃতির অন্যতম মূল সুর যে সম্প্রীতি, সেটির হাতে কলমে চর্চার যে ক্ষেত্র- মেহনতী জনতা, তাঁদেরকে কিছুটা শৌখিনভাবে ব্যবহার করে, তাঁদের আর চৌকাঠ পেরুতে দেওয়া হয় নি।

বাজার অর্থনীতি বাজার দখলের স্বার্থে গ্রাস করে সংস্কৃতিকে। স্বভাবতই এই বাজার অর্থনীতির ধারা বদলে দিয়েছে এপার বাংলার সংস্কৃতির অভিমুখ। রবীন্দ্রনাথ এই বহু ক্ষেত্রেই ফিউশন ছাড়া গাওয়া হয় না। জগঝম্প যন্ত্রাণুষঙ্গ ছাড়া গাওয়া হয় না। লোকসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ বলে যাদের সামাজিক স্বীকৃতি এপারে এখন বহুধা বিস্তৃত তাদের বেশিরভাগ যন্ত্রাণুষঙ্গ ব্যবহারে নামকাওয়াস্তে ট্রাডিশনাল যন্ত্রগুলিকে সামনে রাখে। গানের সুরের প্রবাহমান ধারাকে লোকপ্রিয় করবার তাগিদে ঐতিহ্যের কবরযাত্রা ঘিরেও তাদের কোনও দ্বিধা নেই। সংকোচ তো নেই ই।

এইসব শুনে-দেখে মনে এই শৌখিন মজদুরদের হাতে যদি সংস্কৃতি রক্ষার ঠিকেদারি না বর্তাতো, তাহলে হয়তো, বিশ্বায়নের দাপটের সঙ্গে যুঝবার তাকত মানুষ জল-মাটি-আগুন থেকে অনেক সহজেই সংগ্রহ করে নিতে সক্ষম হতো। সামাজিক বিবর্তনের ধারাতেই ঘটবে সাংস্কৃতিক বিবর্তন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা রেখেই বদল ঘটবে মানুষের রুচি। কিন্তু সেই বদলে থাকবে একটা শৈল্পিক সুষমা। সেই শৈল্পিক সুষমার ধারাকে অক্ষুণœ রাখতে সামাজিকভাবে যারা ক্ষমতাধর- তাদের একটা বিশেষ ভূমিকা চিরকাল থেকেছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়- বিগত তিরিশ বছর ধরে সেই ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রটি কেবল যেন নড়বড়ে করে ফেলেছেন বুদ্ধিজীবী সমাজ। প্রসাদের বদান্যতা বা সরাসরি লালসাই বলা যায়- সেটাই বুদ্ধিজীবী সমাজের একটা বড় অংশকে ক্রমশ উন্মাদ করে দিতে শুরু করেছে। ফলে সাংস্কৃতিক ধারা প্রভাবের মৌলিকতার দিকটা ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে একটা বিকৃত-কিম্ভূত কিমাকার চেহারা নিয়েই চলেছে।

আব্বাসউদ্দিন আহমদের গানটি অবিভক্ত বাংলায় লোকপ্রিয় ছিল না? ’৪৭-এ দেশভাগের এতকাল পরেও এপার বাংলার একটা বড় অংশের মানুষের কাছে আব্বাসউদ্দিন ও তাঁর গান আজও সমান জনপ্রিয়। আব্বাসউদ্দিনকে যিনি একলব্যের মতো ‘গুরু’ বলে মানতেন, সেই অমর পাল, কখনো লোকসঙ্গীত পরিবেশনের ক্ষেত্রে আধুনিকতার নামে বিকৃতির সঙ্গে আপোস করেননি। তাই অমর পালের গ্রহণযোগ্যতা সত্যিকারের শ্রোতার কাছে কখন ও ম্লান হবে না।

গত পঁচাত্তর বছরের মধ্যে বিগত এক দশক ধরে বাঙালি সংস্কৃতির সব থেকে বড় সঙ্কটের জায়গা হলো- সংস্কৃতিকে এখন বাজার নির্ভর করে তোলা হয়েছে। বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই এখন ঠিক করে দেয় কে বা কারা সেরা সাহিত্যিক, সেরা কবি, সেরা শিল্পী, সেরা প্রাবন্ধিক ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তারাই, যাদের হাতে অর্থ ক্ষমতা আছে। রাজনীতির ক্ষমতা আছে। শাসকের মানদ- আছে।

গত পঁচাত্তর বছরে সংস্কৃতির রূপান্তরের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এই পঁচাত্তর বছরর মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ বছর সংস্কৃতির গতিপথের নিয়ন্ত্রক ছিল মেধা। পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ এখন সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রক হলো অর্থ। আর এখন অর্থ থাকলেই ক্ষমতা করায়ত্ত হয়। অতীতে ক্ষমতার সবটা নিয়ন্ত্রক অর্থ ছিল না। এখন ক্ষমতা পুরোপুরি অর্থ নির্ভর। তাই সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ ভারও এখন অনেকটাই অর্থ নিয়ন্ত্রণকারীদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি

আরও খবর